করোনা রোগী বনাম আামাদের সমাজের অমানবিকতা আর একজন চিকিৎসকের সংগ্রাম
করোনা রোগী বনাম আামাদের সমাজের অমানবিকতা আর একজন চিকিৎসকের সংগ্রাম।
আমাদের সমাজের কেউ করোনায় আক্রান্ত হলেই আমরা তাকে সহানুভূতি দেখানোর বদলে সবাই তাকে এলাকা ছাড়া করার পায়তারা করি। অনেক জায়গায় লাঠিসোঁটা দিয়ে তাড়া খেতে হয়েছে করোনা রোগিদের।
যেখানে আমাদের মানবিক হবার দরকার ছিল আমাদের সমাজ সেখানে বোধহয় সবচেয়ে বেশি অমানবিক আচরন করেছে।
চিকিৎসক দের একদিকে যেমন করোনা কে মোকাবেলা করেছে আরেক দিকে মোকাবেলা করেছে সমাজের ঘুনে ধরা এই অমানবিক মূল্যবোধ কে। করোনা, আর সমাজের রক্ত চক্ষুকে চ্যালেঞ্জ করে জয়ী হয়েছেন, বন্দর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আবাসিক চিকিৎসক আলাউল কবির দীপু।
ডা দীপু অক্ষেপ করেছেন এই সমাজের মানুষদের নিয়ে, আরো মানবিক হবার আহবান জানিয়ে নিজের টাইম লাইনে শেয়ার করেছেন সেই ভয়াল অমানবিক দিন গুলোর কথা,নিচে তা হুবুহ তুলে ধরা হলো।
গত মাসের ২১ তারিখে বিকেলবেলা একটা কম্পিত কন্ঠে ফোন আাসে।ফোন এর বিষয় শুনে নিজেই একটু ভড়কে গেলাম।আমার ঠিক পাশের বাসায় একজন করোনা সনাক্ত হয়েছে।মহিলা আমার দুঃসম্পর্ক আত্নীয়। ভড়কে গেলাম এই কারনে যে,করোনা চিকিৎসার যে মূলমন্ত্র হোম কোয়ারান্টাইন তা এই পরিবার কে কস্মিনকালেও বুঝানো যাবেনা। ওনার ছোট ছেলে মহল্লার সবচেয়ে গোয়ার্তমি টাইপের ছেলে, কিছুটা বেয়াদব ও বলা যায়।বাবা নাই ওর ই সব করতে হয়।মার সেবা যত্ন থেকে শুরু করে বাসার বাজার সদায় সবই।তাছারা ওনার একজন নাতি আাছে যে কিনা স্থানীয় মাদ্রাসায় পরে এবং সংলগ্ন মসজিদে নামাজ পরে।ও এতটাই দুষ্ট যে কারো গাছের ফল,কারো ছাদের কবুতর বা কোন কিছু হারালে নিশ্চিন্তে ওর সাথে যোগাযোগ করলেই হদিস মিলত।ওকে কেহ কখনই বাসায় পেত না।এমন একটা পরিবার কে কিভাবে ঘরবন্দী করব!
মহল্লার সবাই বিচলিত। যেহেতু আমি চিকিৎসা পেশার সাথে জড়িত সবাই আমাকে ফোন করে ব্যাতিব্যস্ত করে তুলেছে ।আমি সন্ধার পরে ছেলেকে ডেকে আনলাম।ও প্রথমে ওর মায়ের অসুখের কথা অস্বীকার করল।প্রমান দেখানোর পর ওর চোখে মুখে ভয়ের ছাপ দেখলাম। ওকে বুঝিয়ে বললাম।সকল চিকিৎসার দায়িত্ব নিলাম।যে কোন প্রয়োজনে ফোন দিতে বললাম। ও আশ্বস্ত হল।সব নিয়ম কানুন মেনে চলার অঙিকার করল।কনটাক্ট ট্রেসিং করে বাকি সবাইকে করোনা পরিক্ষা করার জন্য পরের দিন সকাল বেলা উপজেলা হাসপাতালে যেতে বললাম। আাসল নাটক শুরু হল এরপর থেকে। স্থানীয় হুমরা চোমরা রা ঝাপিয়ে পরল আমার উপর। কেন আমি তাদের বাসায় রাখলাম। কেন আমি হাসপাতালে ভর্তি করাচ্ছি না।আমি কি চাই পুরো মহল্লায় ছড়িয়ে যাক।তাদের কে আটকিয়ে রাখবে। কোন দোকানদার যেন কিছু বিক্রি না করে।তারা যাতে নিজেরা ই চলে যায় এমন অবস্থার সৃষ্টি করা।একজন পাতিনেতা ফোন করে ধমকের সুরে কৈফিয়ত চাইল।আমি বললাম আমি চাইলে ই কাউকে হাসপাতালে ভর্তি করাতে পারি না যদি না তার কোন উপসর্গ না থাকে।রোগীনি যদি নিজে ও না চায়।পরে বলল লক ডাউন কর।আমি বললাম লক ডাউন করার ক্ষমতা আমার নাই।আপনারা প্রসাশনকে জানান।উনারা তা ও পারবে না।আমাকে ই তা করতে হবে। আমি বললাম ওনার ছেলের সাথে কথা হয়েছে ওরা বাহির হবে না।যেহেতু ওরা মানুষ ওদের ও ত ক্ষুধা পায় এই ৪২ বেলার খাবার আপনারা দশ টা পরিবার দায়িত্ব নিয়ে রান্না করে ওদের বাসার সামনে দিয়ে আসেন ওরা সেখান থেকে নিয়ে খাবে।তাহলে আর বাহির হতে হবে না। আর ওষুধ যা লাগে আমি দিব নে।ওনার রাগত স্বর নিচু হয়ে আসল।মনে হল ছেড়ে দে মা কেদে বাঁচি। এবার সে সুর পাল্টিয়ে বলল উনি এই রোগ ওনার মেয়ের বাসা থেকে নিয়ে এসেেছে।এইবার আমি রাগত স্বরে যখন বললাম উনি স্থানীয় একটা হৃদরোগ হাসপাতাল থেকে আক্রান্ত হয়েছে তখন চুপসে যেয়ে ফোন কেটে দিল।কিছুক্ষণ পর আরেক ছাত্র নেতা দাবী করা আরেক জন এর ফোন একই কথা। কিছু একটা করতে হবে ভাব।বললাম তুমি দায়িত্ব নেও বাকি সব আমার। আমি হাসপাতালে ভর্তি করে দিব।কিছু ক্ষন পর সে ও লাপাত্তা। এমনিভাবে হাজারো জনের কটু কথা।এমন একটা সময় যেখানে যমদূত সন্নিকটে সে সময় সাহায্য ত দুরের কথা সহানুভূতি ও টুকু মানুষ পেতে পারে না।আমরা কখন যেন নিজের অজান্তেই অমানুষ হয়ে যাই এই ভেবে যে পৃথিবীতে আমি বা আমরা একাই বেচে থাকব অন্যরা নয়।বাস্তবতা হচ্ছে আমাদের নিজেদের বেচে থাকার প্রয়োজনে অন্যদের বাচিয়ে রাখতে হবে।
পুনশ্চঃ মহিলার পর পর দুই টা সেম্পল নেগেটিভ আসছে।তার মানে সে আজ থেকে করোনা মুক্ত। আলহামদুলিল্লাহ।
২.ওনার পরিবারের অন্য সবার রেজাল্ট ও নেগেটিভ আসছে।
এখন ওনারাই কিন্তু কিছু দিন পর প্লাজমা দেবার উপযুক্ত হবেন, আর আপনারা যারা এতো দিন অসহযোগিতা করলেন তাদের কেউ আক্রান্ত হলে উনাদের কেই লাগবে।
আল্লাহ মহান ।তিনি পারেন না এমন কিছু নাই। একটা বারের জন্য ও হলেও আাসুন আমরা মানবিক হই।
ছবিঃসংগ্রিহত(কৃতিত্ব মনজুর সী এইচ সি পি)

Comments
Post a Comment